আনন্দমঠ: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় Anand Math: Bankim Chandra Chattopadhyay

আনন্দমঠ
প্রথম খণ্ড
প্রথম পরিচ্ছেদ

“১১৭৬ সালে গ্রীষ্মকালে এক দিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল। গ্রামখানি গৃহময়, কিন্তু লোক দেখি না। বাজারে সারি সারি দোকান, হাটে সারি সারি চালা, পল্লীতে পল্লীতে শত শত মৃন্ময় গৃহ, মধ্যে মধ্যে উচ্চ নীচ অট্টালিকা। আজ সব নীরব। বাজারে দোকান বন্ধ, দোকানদার কোথায় পলাইয়াছে ঠিকানা নাই। আজ হাটবার, হাটে হাট লাগে নাই। ভিক্ষার দিন, ভিক্ষুকেরা বাহির হয় নাই। তন্তুবায় তাঁত বন্ধ করিয়া গৃহপ্রান্তে পড়িয়া কাঁদিতেছে, ব্যবসায়ী ব্যবসা ভুলিয়া শিশু ক্রোড়ে করিয়া কাঁদিতেছে, দাতারা দান বন্ধ করিয়াছে, অধ্যাপকে টোল বন্ধ করিয়াছে ; শিশুও বুঝি আর সাহস করিয়া কাঁদে না। রাজপথে লোক দেখি না, সরোবরে স্নাতক দেখি না, গৃহদ্বারে মনুষ্য দেখি না, বৃক্ষে পক্ষী দেখি না, গোচারণে গোরু দেখি না, কেবল শ্মশানে শৃগাল-কুক্কুর। এক বৃহৎ অট্টালিকা–তাহার বড় বড় ছড়ওয়ালা থাম দূর হইতে দেখা যায়–সেই গৃহারণ্যমধ্যে শৈলশিখরবৎ শোভা পাইতেছিল। শোভাই বা কি, তাহার দ্বার রুদ্ধ, গৃহ মনুষ্যসমাগমশূন্য, শব্দহীন, বায়ুপ্রবেশের পক্ষেও বিঘ্নময়। তাহার অভ্যন্তরে ঘরের ভিতর মধ্যাহ্নে অন্ধকার, অন্ধকারে নিশীথফুল্লকুসুমযুগলবৎ এক দম্পতি বসিয়া ভাবিতেছে। তাহাদের সম্মুখে মন্বন্তর।

১১৭৪ সালে ফসল ভাল হয় নাই, সুতরাং ১১৭৫ সালে চাল কিছু মহার্ঘ হইল– লোকের ক্লেশ হইল, কিন্তু রাজা রাজস্ব কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়া লইল। রাজস্ব কড়ায় গণ্ডায় বুঝাইয়া দিয়া দরিদ্রেরা এক সন্ধ্যা আহার করিল। ১১৭৫ সালে বর্ষাকালে বেশ বৃষ্টি হইল। লোকে ভাবিল, দেবতা বুঝি কৃপা করিলেন। আনন্দে আবার রাখাল মাঠে গান গায়িল, কৃষকপত্নী আবার রূপার পৈচাঁর জন্য স্বামীর কাছে দৌরাত্ম্য আরম্ভ করিল। অকস্মাৎ আশ্বিন মাসে দেবতা বিমুখ হইলেন। আশ্বিনে কার্তিকে বিন্দুমাত্র বৃষ্টি পড়িল না, মাঠে ধান্যসকল শুকাইয়া একেবারে খড় হইয়া গেল, যাহার দুই এক কাহন ফলিয়াছিল, রাজপুরুষেরা তাহা সিপাহীর জন্য কিনিয়া রাখিলেন। লোকে আর খাইতে পাইল না। প্রথমে এক সন্ধ্যা উপবাস করিল, তার পর এক সন্ধ্যা আধপেটা করিয়া খাইতে লাগিল, তার পর দুই সন্ধ্যা উপবাস আরম্ভ করিল। যে কিছু চৈত্র ফসল হইল, কাহারও মুখে তাহা কুলাইল না। কিন্তু মহম্মদ রেজা খাঁ রাজস্ব আদায়ের কর্তা, মনে করিল, আমি এই সময়ে সরফরাজ হইব। একেবারে শতকরা দশ টাকা রাজস্ব বাড়াইয়া দিল। বাঙ্গালায় বড় কান্নার কোলাহল পড়িয়া গেল।

লোকে প্রথমে ভিক্ষা করিতে আরম্ভ করিল, তার পরে কে ভিক্ষা দেয়!–উপবাস করিতে আরম্ভ করিল। তার পরে রোগাক্রান্ত হইতে লাগিল। গোরু বেচিল, লাঙ্গল জোয়াল বেচিল, বীজ ধান খাইয়া ফেলিল, ঘরবাড়ী বেচিল। জোত জমা বেচিল। তার পর মেয়ে বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর ছেলে বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর স্ত্রী বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর মেয়ে, ছেলে, স্ত্রী কে কিনে? খরিদ্দার নাই, সকলেই বেচিতে চায়। খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল, ঘাস খাইতে আরম্ভ করিল, আগাছা খাইতে লাগিল। ইতর ও বন্যেরা কুক্কুর, ইন্দুর, বিড়াল খাইতে লাগিল। অনেকে পলাইল, যাহারা পলাইল, তাহারা বিদেশে গিয়া অনাহারে মরিল। যাহারা পলাইল না, তাহারা অখাদ্য খাইয়া, না খাইয়া, রোগে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল।
রোগ সময় পাইল, জ্বর, ওলাউঠা, ক্ষয়, বসন্ত। বিশেষত: বসন্তের বড় প্রাদুর্ভাব হইল। গৃহে গৃহে বসন্তে মরিতে লাগিল। কে কাহাকে জল দেয়, কে কাহাকে স্পর্শ করে। কেহ কাহার চিকিৎসা করে না ; কেহ কাহাকে দেখে না ; মরিলে কেহ ফেলে না। অতি রমণীয় বপু অট্টালিকার মধ্যে আপনা আপনি পচে। যে গৃহে একবার বসন্ত প্রবেশ করে, সে গৃহবাসীরা রোগী ফেলিয়া ভয়ে পলায়।”

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

***

Anand Math
Part 1

The sun burned down very fiercely indeed on a summer’s day of 1176 (Bengali era) in the village of Pawdochinho.The village was filled with houses but no one was to be seen. There were rows of shops and sheds in the market place, hundreds of mud houses in its neighbourhoods and occasionally there were larger houses more than a storey high. Today they were all silent. The shops were closed in the market and no one had any idea where the shopkeepers had escaped to. It was market day today, but no one had brought their wares. It was a good day for begging, but not one beggar was to be seen on the street. The weaver wept in a corner of his home, his loom silenced; the businessman was doing the same with his child in his arms without a thought for trade, the compassionate had stopped giving, the teacher had closed his school down; I suppose even the child did not dare to cry aloud. I saw no one on the main road, no bather by the lake nor householder at the door; no birds upon the trees nor cows in the field and only jackals and dogs roam the cremation grounds. One vast mansion – whose fluted columns can be seen from afar – stands like a mountain peak amid the forest of houses. But what of its beauty? For its doors are locked, there are no signs of human habitation and even the outside air cannot enter it. The rooms inside are darkened at midday and like a pair of night blooming flowers within that darkness, a couple sits worried for they are facing the prospect of famine.

The harvest had not been good in 1174 and thus rice was a little expensive in 1175 – the people suffered but their government still took care to collect the taxes in full. After paying their taxes in full the poor began eating once, at night. In 1175 there were good rains during the wet season. People thought that perhaps the gods were looking on them favourably. The cowherd sang happily in the field once again and the farmer’s wife pressed her husband once more for a silver bauble for herself. But suddenly the gods frowned in the following month. There was not a drop of rain in the months of Aswin and Kartika and all the rice plants turned to dry straw in the fields. The farmers who had grown a few cups of grain had to sell it to the government as feed for the soldiers. People now had nothing more to eat. At first they missed one meal. Then they ate half of what they needed to fill their bellies. Then they missed both meals. Whatever harvest the month of Chaitra brought was not enough for anyone. But Muhammad Reza Khan who was the head tax collector decided that he would be very efficient that year and increased the taxes by ten rupees for every hundred rupees earned. There was much sorrow throughout Bengal.

At first people began begging but then that dried up so they had to fast. Then they began falling ill. They sold their cows and their ploughs; they ate all the seed they had been saving for the following season and sold their houses. They sold their land and then they sold their daughters. After that it was time to sell their sons. Then it was the turn of the wives to be sold. But after that? Who wants to buy girls, boys or wives? There were no buyers, for everyone was trying to sell. They ate leaves in the absence of food. They ate grass. They even ate weeds. The poorest and the forest folk ate the flesh of dogs, rats and cats. Many ran away, but they escaped only to die of starvation in strange lands. The ones who did not run died at home after eating whatever they could lay their hands on and from disease.

Then came disease; fevers, cholera, tuberculosis, smallpox. The pox did especially well. People died of it in every home. None gave them a drink when they were thirsty, for who was going to touch the ill? No one offered the sick any treatment; no one tended to them; no one would touch the dead once life had left them. Once beautiful bodies now rotted inside mansions. Once the pox entered a house, the inhabitants left their ill and ailing and ran for their lives.

~ Bankim Chandra Chattopadhyay
(Translation, mine)

The first true Bengali novelist, he was born on this day in 1838. He worked as a Deputy Collector in Jessore from 1858 and his accounts of the poverty that was the lot of the heavily taxed peasants of Bengal are brutal and true to life. Anandmath was based on what he had seen during his career and on the Sannyasi Fakir revolt of the late 18th century. This novel gave us the patriotic song Vande Mataram.

Advertisements
This entry was posted in Bankim Chandra Chattopadhyay, Bengal, Books, Freedom struggle, History, Our history and tagged , , , . Bookmark the permalink.

2 Responses to আনন্দমঠ: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় Anand Math: Bankim Chandra Chattopadhyay

  1. spunkybong says:

    Heartrendingly beautiful.

  2. Aami Aabir says:

    Ma ja chhilen, ja hoiyachhen..

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s